হাওজা নিউজ এজেন্সি পবিত্র মহররম মাস উপলক্ষে জিয়ারতে আশুরা শীর্ষক বিশেষ সিরিজ প্রকাশ করছে। এতে হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন জাওয়াদ মুহাদ্দেসির উপস্থিতিতে জিয়ারতে আশুরার ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা হচ্ছে, যাতে আহলে বাইত (আ.)-এর জ্ঞানের ভাণ্ডারে প্রবেশের নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়; এবং এই বিশেষ সিরিজটি সম্মানিত পাঠকবৃন্দ ও সাইয়্যেদুশ শুহাদা (আ.)-এর প্রতি অনুগত শোকাহতদের উদ্দেশে নিবেদন করা হয়েছে:
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম ওয়া বিহি নাস্তাঈন।আসসালামু আলাইকা ইয়া আবা আবদিল্লাহ।
জিয়ারতে আশুরার এই পবিত্র অংশের ব্যাখ্যায় তিনি বলেন—
يَا أَبَا عَبْدِاللَّهِ لَقَدْ عَظُمَتِ الرَّزِيَّةُ وَجَلَّتْ وَعَظُمَتِ الْمُصِيبَةُ بِكَ (بِكُمْ) عَلَيْنَا وَعَلَى جَمِيعِ أَهْلِ الْإِسْلَامِ...
بِأَبِي أَنْتَ وَأُمِّي لَقَدْ عَظُمَ مُصَابِي بِكَ فَأَسْأَلُ اللَّهَ الَّذِي أَكْرَمَ مَقَامَكَ وَأَكْرَمَنِي بِكَ ...
أَنْ يَرْزُقَنِي طَلَبَ ثَارِكَ مَعَ إِمَامٍ مَنْصُورٍ مِنْ أَهْلِ بَيْتِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ ...
“ফিদা হওয়ার” ইসলামী ও আশুরার সংস্কৃতি
“ফিদা হওয়া”র অর্থ হলো সত্য ও ইসলামের মহান আদর্শের পথে নিজের জীবন উৎসর্গ করার মানসিকতা ও প্রস্তুতি। বিভিন্ন জিয়ারতে আমরা ইমামদের উদ্দেশে বলি— আমার “পিতা-মাতা তোমার জন্য কুরবান”—এবং অনেক জায়গায় আরও বিস্তৃতভাবে বলা হয়: আমার পিতা, মাতা, সন্তান, পরিবার ও আমার সবকিছুই আপনার জন্য উৎসর্গ।
এই “নিজেকে উৎসর্গ করার সংস্কৃতি” আজও ইসলামী বিপ্লব, শহীদদের আদর্শ এবং ওলায়াতের ধারণার সাথে গভীরভাবে সম্পৃক্ত, যার মূল ভিত্তি হলো জিয়ারতে আশুরা এবং আশুরার সংস্কৃতি।
আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে প্রার্থনা করি—তিনি যিনি আবা আবদুল্লাহ (আ.)-এর মর্যাদা সমুন্নত করেছেন, তাঁর অবস্থানকে উচ্চ করেছেন এবং তাঁর মাধ্যমে আমাদেরকেও সম্মানিত করেছেন—তিনি যেন আমাদেরকে তাঁর সাথে সম্পর্ক ও আহলে বাইত (আ.)-এর ওলায়াতের বরকতে আমাদের চাওয়া-পাওয়া দান করেন।
“রক্তের প্রতিশোধ প্রার্থনা” এর অর্থ
জিয়ারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো—
أَنْ يَرْزُقَنِي طَلَبَ ثَارِكَ
অর্থাৎ: আল্লাহ যেন আমাকে আপনার রক্তের প্রতিশোধ প্রার্থনাকারীদের অন্তর্ভুক্ত করেন।
এ প্রসঙ্গে প্রশ্ন উঠতে পারে—ইমাম হুসাইন (আ.)-এর হত্যাকারীদের তো বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনার মাধ্যমে শাস্তি হয়েছে; যেমন মুখতার সাকাফির আন্দোলনে বহু অপরাধীর বিচার হয়েছে এবং “ইয়া লাথারাতিল হুসাইন” (হুসাইনের রক্তের প্রতিশোধ) শ্লোগানও তোলা হয়েছিল।
তাহলে এই “রক্তের প্রতিশোধ” কথার প্রকৃত অর্থ কী?
এর উত্তর হলো—কারবালার ঘটনা কেবল শারীরিক হত্যাকাণ্ড ছিল না; বরং এটি ছিল ইসলামের সত্য, ন্যায় ও ধর্মীয় মূল্যবোধের ওপর আঘাত, অর্থাৎ বাস্তবে ইসলামি চেতনা ও দীনকে হত্যার চেষ্টা।
কারবালার প্রকৃত প্রতিশোধ ও ইমাম মাহদী (আ.ফা.)
কারবালার প্রকৃত বিপর্যয় ছিল সত্য ও ন্যায়ের ওপর আঘাত। এর প্রকৃত প্রতিকার তখনই সম্পূর্ণ হবে, যখন ইসলাম তার প্রকৃত অবস্থানে ফিরে আসবে এবং সমাজে আল্লাহর ন্যায়ভিত্তিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে।
এই কারণেই জিয়ারতে আশুরায় বলা হয়েছে—
أَنْ يَرْزُقَنِي طَلَبَ ثَارِكَ مَعَ إِمَامٍ مَنْصُورٍ مِنْ أَهْلِ بَيْتِ مُحَمَّدٍ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ
অর্থাৎ এই রক্তের প্রতিশোধ তখনই পূর্ণতা পাবে, যখন তা একজন “ইমাম মানসুর”—আল্লাহর সাহায্যপ্রাপ্ত বিজয়ী ইমামের নেতৃত্বে সংঘটিত হবে।
এই কারণে প্রকৃত প্রতিশোধকারী হলেন ইমাম মাহদী (আ.ফা.)। যেমন দোয়া নুদবায় বলা হয়েছে:
أَيْنَ الطَّالِبُ بِدَمِ الْمَقْتُولِ بِكَرْبَلاء”
অর্থাৎ: কোথায় তিনি, যিনি কারবালার শহীদের রক্তের (বদলার) দাবিদার?
এছাড়াও দোয়া নুদবার অন্যান্য অংশে বলা হয়েছে:
أَيْنَ الْمُعَدُّ لِقَطْعِ دَابِرِ الظَّلَمَةِ / أَيْنَ الْمُنْتَظَرُ لِإِقَامَةِ الْأَمْتِ وَالْعِوَجِ / أَيْنَ الْمُرْتَجَى لِإِزَالَةِ الْجَوْرِ وَالْعُدْوَانِ / أَيْنَ الْمَدَّخَرُ لِتَجْدِيدِ الْفَرَائِضِ وَالسُّنَنِ / أَيْنَ الْمُتَخَيَّرُ لِإِعَادَةِ الْمِلَّةِ وَالشَّرِيعَةِ / أَيْنَ الْمُؤَمَّلُ لِإِحْيَاءِ الْكِتَابِ وَحُدُودِهِ / أَيْنَ مُحْيِي مَعَالِمِ الدِّينِ وَأَهْلِهِ
অর্থাৎ তিনি সেই মহান ব্যক্তি, যিনি ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন, জুলুম নির্মূল করবেন, ধর্মকে পুনরুজ্জীবিত করবেন এবং আল্লাহর বিধানকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন।
যখন ইমাম মাহদী (আ.ফা.) প্রকাশিত হবেন এবং ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক মেহেদী সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, তখনই এই দোয়ার বাস্তবায়ন ঘটবে। এ কারণেই আমরা দোয়া ইফতিতাহে বলি—
اللَّهُمَّ إِنَّا نَرْغَبُ إِلَيْكَ فِي دَوْلَةٍ كَرِيمَةٍ تُعِزُّ بِهَا الْإِسْلَامَ وَأَهْلَهُ وَتُذِلُّ بِهَا النِّفَاقَ وَأَهْلَهُ ...
আমরা এমন এক সম্মানিত রাষ্ট্রের প্রত্যাশী, যেখানে সত্যপন্থীরা সম্মানিত হবে এবং মিথ্যা ও কপটতা অপমানিত হবে।
আশুরার সংস্কৃতি ও প্রতিশোধের আদর্শ
এই দোয়া আমাদের শেখায় যে, প্রকৃত হুসাইনী পরিচয় হলো ইমাম মাহদি (আ.জ.)-এর নেতৃত্বে সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে অংশগ্রহণ করা।
এটি কেবল আবেগ নয়; বরং একটি আদর্শিক, বাস্তব ও ঐতিহাসিক দায়িত্ব।
আল্লাহর কাছে মর্যাদা ও সম্মান
আমরা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি—
اللَّهُمَّ اجْعَلْنِي عِنْدَكَ وَجِيهًا بِالْحُسَيْنِ عَلَيْهِ السَّلَامُ فِي الدُّنْيَا وَالْآخِرَةِ
অর্থাৎ হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে দুনিয়া ও আখিরাতে ইমাম হুসাইন (আ.)-এর মাধ্যমে মর্যাদাবান করুন।
দুনিয়ার মর্যাদা আহলে বাইত (আ.)-এর সাথে সম্পর্কের মাধ্যমে অর্জিত হয়, আর আখিরাতের মর্যাদা ইমাম হুসাইন (আ.)-এর শাফাআতের মাধ্যমে।
দোয়া তাওয়াসসুলেও আমরা বলি—
> يَا وَجِيهًا عِنْدَ اللَّهِ اشْفَعْ لَنَا عِنْدَ اللَّهِ
অর্থাৎ: হে আল্লাহর দরবারে মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিগণ! আমাদের জন্য আল্লাহর দরবারে সুপারিশ করুন।
আশা করা যায়, আমরা যেন জিয়ারতে আশুরাকে কেবল পাঠ হিসেবে নয়, বরং জীবনের বাস্তব আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করি। আহলে বাইত (আ.)-এর প্রতি ভালোবাসা যেন কেবল মৌখিক না হয়ে আমাদের জীবনাচরণ, আনুগত্য ও আমলের মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়।
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
আপনার কমেন্ট